ইউক্রেন হামলার জেরে প্রায় তিন বছর বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাশিয়া। গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরই সূত্র ধরে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য বিশ্লেষকদের মতে, মস্কোর হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া ততটা সহজ হবে না। রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বিনিয়োগের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও আস্থা পুনরুদ্ধারে দেশটিকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় সংঘাতের সূত্রপাত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর অনেক সরকার মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো দেশটি থেকে সরে যায়। ফলে বিশ্বের অন্যতম অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ব্যাপক পতন ঘটে।
গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির ধারণাকে সমর্থন করেছেন। শিগগিরই এ বিষয়ে সরাসরি বৈঠকও করতে পারেন পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে রাশিয়ার আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পুনরায় বেড়েছে। তবে বিনিয়োগ আস্থার জন্য শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট হবে না বলে মনে করেন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান পেপারস্টোনের গবেষণা কৌশলবিদ আহমদ আসসিরি।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়াকে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে পুনরায় যুক্ত করতে হলে আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি প্রয়োজন। এতে এমন শর্ত থাকতে হবে, যা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পাশাপাশি সুইফটের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ও ঋণ বাজারে বিধিনিষেধ কমাবে।’
বিশেষত যেসব বিনিয়োগকারী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েনি রাশিয়ার বাজারে তাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে খুব দ্রুত আর্থিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করলে এসব বিনিয়োগকারীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ দেশটি ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এমনটা বলেছেন দুবাইভিত্তিক সেঞ্চুরি ফাইন্যান্সিয়ালের প্রধান বাজার বিশ্লেষক অরুণ জন।
তিনি বলেন, ‘যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়া হয় বা পরবর্তী সময়ে আবার আরোপ করা হয়, তবে আইনি ঝুঁকি থেকে যায়। রাশিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন করাও সহজ হবে না, কারণ বিনিয়োগের অর্থ যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। এ অনিশ্চয়তা অনেক বিনিয়োগকারীকে রাশিয়ার বাজারে ফেরার ব্যাপারে সতর্ক রাখবে।’
কিছু প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলতি বছরে শুরু হতে পারে। তবে ২০২৭ সালের আগে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়া সম্ভব হবে না। যুদ্ধবিরতিতে অগ্রগতি হলে বছরের মাঝামাঝিতে খাদ্য, সার, ওষুধ ও কিছু ব্যাংকিং পরিষেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে যেকোনো চুক্তি ইউরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দশমিক ২ শতাংশ ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি তেল উৎপাদন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমিত প্রবৃদ্ধি হতে পারে। কারণ এটি বিরোধী পক্ষের নিষেধাজ্ঞা নয়, ওপেক প্লাসের নীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। সেই সঙ্গে রাশিয়ায় অংশীদারত্ব থাকা বিপি-রোসনেফট এবং টোটালএনার্জিস-নোভাটেকের মতো কোম্পানির আয় বাড়তে পারে।
আর্থিক বাজারে রাশিয়ার প্রতি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ বাড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে ডলার ও ইউরোনির্ভর রুশ বন্ডের চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় মূল্য বাড়ে প্রায় ৫ শতাংশ। মূলত ট্রাম্প যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাবেন এমন প্রত্যাশার সঙ্গে বাজারের এ পরিস্থিতি সম্পর্কিত।
বিনিয়োগকারীদের আশা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা তুলে নেয়া হলে বর্তমানে বড় ছাড় পাওয়া রুশ আর্থিক সম্পদের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে পারে। এছাড়া একই সময়ে রুশ করপোরেট ঋণেও পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৮০ সেন্টের নিচে বাণিজ্য করা সংকটাপন্ন বন্ডের পরিমাণ ১৩ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৫৩০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অরুণ জন বলেন, ‘এটি বছরের সবচেয়ে বড় পতনগুলোর একটি, যা রাশিয়ান ক্রেডিটে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বৃদ্ধি নির্দেশ করে।’
যুদ্ধ শেষ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ মুদ্রা রুবলের চাহিদা বাড়তে পারে। এরই মধ্যে মস্কো-ওয়াশিংটনের সম্পর্ক উন্নতির প্রত্যাশার মধ্যে মুদ্রাটির অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। গত এক মাসে ডলারের বিপরীতে প্রায় ১০ শতাংশ ও চীনের ইউয়ানের বিপরীতে ৭ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে রুবল।
যুদ্ধবিরতি স্বল্পমেয়াদে রুবলের জন্য সহায়ক হলেও গভীরতর কাঠামোগত সমস্যা থেকে যাবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা এখনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রুশ প্রবেশাধিকার সীমিত করছে, যা অর্থপ্রবাহ সীমিত করছে এবং বাণিজ্য নিষ্পত্তিকে জটিল করে তুলছে বলে মন্তব্য করেন আহমদ আসসিরি। তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাত পূর্ণমাত্রার স্বাভাবিক না হলে রুবল নীতিগত অনিশ্চয়তার ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।’
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমায় রাশিয়ার শেয়ারবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতা, পশ্চিমা মূলধন প্রবাহ ও করপোরেট খাতের প্রতি আস্থার পুনরুদ্ধারের ওপর।
বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, কিছু পশ্চিমা কোম্পানি যাতে ফিরে আসতে পারে এ নিয়ে ‘গোপন আলোচনায়’ নেমেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘যে খাতগুলো এরই মধ্যে রুশ কোম্পানির দখলে গেছে সেগুলো সংরক্ষিত থাকবে।’